প্রায় সতের মিনিট হতে চলল আমি মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করছি। আমার বিরক্ত লাগছে না, বরং সুবিধাই হয়েছে, মেয়েটির সাথে আমার কি কথা হবে তা মনে মনে গুছিয়ে নেয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছে। ঘড়ি দেখলাম, আরও চার মিনিট পার হয়েছে। সাতটা একুশ বাজে। আমার মনে মনে কথা গুছিয়ে নেয়া বোধহয় শেষ। কারন এবার আমি সত্যিই অপেক্ষা করছি এবং বিরক্ত হচ্ছি। অনন্তকাল পরে আবার ঘড়ি দেখলাম, সাতটা বাইশ। আচ্ছা মেয়েটি দেরী করছে কেন? আমি কি তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছি? মোবাইলে একটা মেসেজ আসল, আমি আগ্রহ নিয়ে দেখলাম, জিপি অফার, দিনে দিনে এরা সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চাইলে অবশ্য মুহূর্তেই এই টেনশানের নিষ্পত্তি করা যায়। মেয়েটিকে ফোন করে জেনে নিলেই হয় কি হয়েছে? কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সেটা করা ঠিক হবে না। সে যে কিছু একটা ভুল করেছে আমি সেটা তাকে বুঝতে দিতে চাই না। মনে মনে আমি দীর্ঘ অপেক্ষার প্রস্তুতি নিলাম। সাতটা চব্বিশ। আইন্সটাইনের টাইম ডাইলেশন যুক্তি কাজ করছে। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে কে যেন আসছে। আবছামত দেখা যাচ্ছে দূর থেকে। আমি ভাল করে তাকালাম, মেয়েটি খুব সাবধানে হেঁটে আসছে। আমার অপেক্ষার মেয়েটির সাথে আমার কখনও দেখা হয়নি। তবে আমি অসংখ্য ছবি দেখেছি তার। কল্পনায় আমি তার একটি ছবি নিয়ে আসলাম, সাবধানে হেঁটে আসা মেয়েটি গ্লাসডোর ধাক্কা দিয়ে ঢুকল। আমি কল্পনায় ছবিটি আরেকবার দেখে মেয়েটির দিকে তাকালাম, একটু করে মুচকি হাসলাম, কারন আমার অপেক্ষার শেষ হয়েছে। মেয়েটি সময় নিয়ে দরজা বন্ধ করছে। এভাবে দরজা বন্ধ করার প্রবনতা শুধু একা মানুষদের মধ্যেই দেখা যায়। আচ্ছা মেয়েটি কি একা? এই প্রথম মেয়েটি সোজাসুজি আমার দিকে ঘুরল, আমি চমকে উঠলাম। আমার দেখা ছবির সাথে এই মেয়েটির মিল খুব সামান্যই। মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি দ্বিধাগ্রস্ত হলাম, আমি কি সত্যিই এই মেয়েটির জন্যই অপেক্ষা করছি? আমার সাথে কখনও কোন হূরপরীর পরিচয় হয়নি।
মেয়েটি আমার সামনে বসে আছে। আমাদের সামনে কফি মগ। মেয়েটি হালকা করে চুমুক দিল। দেখে মনে হচ্ছে, খুব অপ্রিয় একটা দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের কফি খাওয়ার কথা ছিল।
মেয়েটি চুপ করে আছে। ইনহিবিশন বলে একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে তাই। প্রথম বাধাটি সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। কলসেন্টারে প্রতিদিন মেয়েটিকে প্রায় একশজন অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। এই মেয়েটির জন্য ইনহিবিশনে ভোগাটা খুব অস্বাভাবিক। মানুষ খুব বিশেষ এক প্রানী। আমি মেয়েটিকে সময় দিলাম। সে নিজেকে গুছিয়ে নিক। কারন আমি জানি ইনহিবিশন কেটে গেলেই মেয়েটি কথা বলবে, অনেক কথা বলবে। আমি আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটির কপালে কয়েক ফোঁটা ঘাম জমেছে। রুম টেম্পারেচার আঠারো ডিগ্রী সেলসিয়াস। আমার হালকা শীত শীত লাগছে। আচ্ছা মেয়েটি ঘামছে কেন? ও কি নিয়ে এত চিন্তা করছে? আমার খুব ইচ্ছা করছে মেয়েটির কপালের ঘাম মুছে দেই। আচ্ছা প্রথম পরিচয়ে কি কারও কপালে হাত রাখা যায়? ভাল ছেলেরা নিশ্চয় এমনটা করে না? আমাকে অবশ্যই ভাল ছেলে হতে হবে, আমাকে অবশ্যই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
আমি অপেক্ষা করছি, আচ্ছা মেয়েটি প্রথমে আমাকে কি বলবে? মেয়েটি কেমন যেন অপ্রস্তুত মূর্তির মত বসে আছে। আমি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার ঠোঁটজোড়া কি কাঁপছে? বুঝতে পারছি না। মেয়েটি আমার দিকে তাকাল, আচ্ছা সে কি এই প্রথম বার আমার দিকে তাকালো? মনে হয়। -"তোমার গালে টোল পড়ে আমি জানতাম না..." আমি আর কিছু শুনলাম না। মেয়েটি কথা বলছে। আমি চাই সে আর না থামুক, যা ইচ্ছা হয় বলুক। আমার শুনতে ভালো লাগছে।
আমি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। দীর্ঘ কথোপকথনের প্রস্তুতি নিলাম। অনেক কথা জমে আছে আজ। সব শেষ করেই তবে ঘরে ফিরব। আর যদি কখনও দেখা না হয়। কারন, হলফ করে বলছি, আমার সাথে কখনও কোনো হূরপরীর পরিচয় ছিল না।
দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় আসবে বোধহয়, আসুক। ঝড় কি আসেনি? -এই মনে?
© সাঈদ
পঁচিশ ছয় ষোল







